উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে ব্রিটেনের এত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক যে স্বার্থের কারণে
ছবির উৎস,GETTY IMAGES
ছবির ক্যাপশান,
শেখ নাহিয়ান আল নাহিয়ান তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজপরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের বিরুদ্ধে এক ব্রিটিশ নারী যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছিলেন। এই অভিযোগের কথা এ মাসে ফাঁস হওয়ার পর তা হতবাক করেছে অনেককে।
৩২ বছর বয়সী এই মহিলার নাম কেইটলিন ম্যাকনামারা। তিনি ব্রিটেনের সানডে টাইমস পত্রিকায় দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তার অভিযোগের বিস্তারিত জানিয়েছেন।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে কেইটলিন ম্যাকনামারা ছিলেন আবুধাবীতে। সেখানে তিনি 'হে সাহিত্য উৎসব' আয়োজনের কাজ করছিলেন। তখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের ৬৯ বছর বয়স্ক মিনিস্টার অব টলারেন্স বা সহনশীলতা বিষয়ক মন্ত্রীর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয় এক নিরালা রাজপ্রাসাদে। কেইটলিন ম্যাকনামারা জানিয়েছেন সেখানেই তার ওপর এই যৌন হামলা চালানো হয়।
মন্ত্রী শেখ নাহিয়ান আল নাহিয়ান অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করছেন। তিনি আবুধাবীর রাজপরিবারের একজন সিনিয়র সদস্য। ব্রিটেনে তার যে বাড়ি আছে, সেটির দাম কোটি পাউন্ডের ওপরে।
কেইটলিন ম্যাকনামারা ব্রিটেনে ফিরে আসেন এবং গত জুলাই মাসে লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশের কাছে এই কথিত যৌন হামলার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।
কয়েকটি কারণে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত এখনো শুরু হয়নি। এর একটি হচ্ছে, ঘটনাটি ঘটেছে ভিন্ন দেশে, যা লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের এখতিয়ারের বাইরে। এ ঘটনার ব্যাপারে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পুলিশের কাছে কোন অভিযোগ নেই। আর যার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তোলা হয়েছে, তিনি যেহেতু রাজপরিবারের সদস্য, তাই তিনি ''সার্বভৌম সুরক্ষা''র অধিকার ভোগ করেন। অর্থাৎ কোন অভিযোগে তার বিচার করা যায় না।
কেইটলিন ম্যাকনামারার আইনজীবী হিসেবে কাজ করছেন ব্যারনেস হেলেনা কেনেডি কিউসি। বিবিসি রেডিও ফোরের ''উইমেন্স আওয়ার'' অনুষ্ঠানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তিনি চান ব্রিটিশ সরকার যেন এই ঘটনার ব্যাপারে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর চাপ দেয়। তবে তিনি স্বীকার করেন যে আইনগতভাবে এটি করা বেশ কঠিন হবে।
'হে ফেস্টিভ্যাল' এ ঘটনায় তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তারা বলেছে, অভিযুক্ত মন্ত্রী যতদিন তার পদে আছেন, ততদিন তারা আর আবুধাবীতে এই উৎসব করবে না।
তবে এ ঘটনার ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিক থেকে কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। কেবল মন্ত্রী শেখ নাহিয়ান আল নাহিয়ানের একজন আইনজীবী এই অভিযোগ অস্বীকার করে একটি বিবৃতি দিয়েছেন এবং এই অভিযোগ যেভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়েছে সে ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
শেখ নাহিয়ান ১৯৯২ সাল হতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। নিজ দেশে তিনি বেশ পরিচিত এবং সন্মানিত এক ব্যক্তি। তাকে এখনো পর্যন্ত তার পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়নি।
ব্রিটেনের সঙ্গে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ। কিন্তু এই সম্পর্কে মাঝে মধ্যেই মারাত্মক সংকট তৈরি করছে একের পর এক এধরণের কিছু ঘটনা। এবারেরটি সেরকমেরই এক মারাত্মক অভিযোগ।
উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্কে এরকম অস্বস্তিকর ঘটনা ঘটছে সেই ১৯৮০ সাল থেকেই। সেবছর ব্রিটেনের একটি টেলিভিশন চ্যানেল আইটিভি-তে 'ডেথ অব এ প্রিন্সেস' বলে এক ডকুমেন্টারি-ড্রামা দেখানো হয়েছিল। এক সৌদি রাজকুমারী এবং তার প্রেমিককে জনসমক্ষে শিরোশ্চেদ করার ঘটনা নিয়ে ছিল অনুষ্ঠানটি।
ছবির উৎস,EPA
ছবির ক্যাপশান,
ম্যাথিউ হেজেস বলেছেন, তিনি গুপ্তচর ছিলেন না, পিএইচডির জন্য গবেষণা করছিলেন
এই অনুষ্ঠান প্রচার করার পরিণামে ব্রিটেনকে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রায় ২৫ কোটি পাউন্ডের ব্যবসা হারাতে হয়। এখন হয়তো অনেকে সেই ঘটনার কথা ভুলে গেছেন।
সৌদি আরবে এখন নারী অধিকার পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু বাকি বিশ্বের অবস্থার সঙ্গে তাদের পরিস্থিতির এখনো বিরাট ফারাক।
১৯৮৪ সালে ঘটেছিল আরেকটি ঘটনা। সৌদি আরবে তৎকালীন বিদায়ী ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত স্যার জেমস ক্রেইগ এক গোপন কূটনৈতিক বার্তা পাঠিয়েছিলেন লন্ডনে তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে। সেখানে তিনি বলেছিলেন, সৌদি সরকার হচ্ছে 'অযোগ্য এবং তাদের চারপাশের দুনিয়ায় যা ঘটছে সেগুলো থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন, দুনিয়া সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ।'
এই অতি গোপন কূটনৈতিক বার্তাটি ফাঁস হয়ে গেল। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দফতরের জন্য এটি এক সাংঘাতিক বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করলো।
২০১৮ সালে ঘটেছিল আরেক ঘটনা। সেবছর দুবাইতে পিইচডির জন্য গবেষণারত এক ব্রিটিশ ছাত্র ম্যাথিউ হেজেসকে গ্রেফতার করে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ব্রিটেন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্কে সেটি এক বড় কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়।
ম্যাথিউ হেজেসের গবেষণা ছিল আরব বসন্তের বিদ্রোহের পর আরব দেশগুলোর নিরাপত্তা বিষয়ে। কিন্তু আরব আমিরাতের কর্মকর্তারা দাবি করলেন, তারা ম্যাথিউ হেজেসের ল্যাপটপে এমন কিছু জিনিস পেয়েছেন, যা প্রমাণ করে তিনি একজন গুপ্তচর। ম্যাথিউ হেজেস এই অভিযোগ অস্বীকার করেন।
ম্যাথিউ হেজেসকে কয়েক মাস ধরে আটকে রাখা হয়। পরে অবশ্য তাকে ক্ষমা করে মুক্তি দেয়া হয়। কিন্তু ম্যাথিউ হেজেস অভিযোগ করেন, বন্দি থাকা অবস্থায় তাকে নির্জন কারাবাসে রেখে তার ওপর মানসিক নিপীড়ন চালানো হয়েছিল।
সংযুক্ত আরব আমিরাত এখনো মনে করে ম্যাথিউ হেজেস একজন গুপ্তচর ছিলেন। কিন্তু ব্রিটেন বলছে, তিনি গুপ্তচর ছিলেন না।
এ বছরের শুরুতে কোভিড-১৯ মহামারি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার কিছু আগে লন্ডনের হাইকোর্টে শুরু হয়েছিল এক সাড়া জাগানো আইনি লড়াই। এই মামলার একদিকে দুবাইর শাসক শেখ মোহাম্মদ আল-মাখতুম। অন্যপক্ষে তার সাবেক স্ত্রী , জর্ডানের প্রিন্সেস হায়া।
শেখ মোহাম্মদ আল-মাখতুমের সর্বাত্মক চেষ্টা ছিল প্রিন্সেস হায়া যেসব গুরুতর অভিযোগ এনেছেন সেগুলি যেন প্রকাশ না পায়। কিন্তু আদালতের বিচারকদের রায় গেল তার বিপক্ষে।
এই রায়ের পর ৭০ বছর বয়সী শেখ মোহাম্মদ আল মাখতুম, যিনি ঘোড়দৌড়ের জগতে খুবই বিখ্যাত, তার ব্যাপারে অনেক গোপন কথা ফাঁস হয়ে গেল। বিশ্বের সবচেয়ে নামকরা ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতাগুলোর একটি হচ্ছে ব্রিটেনের অ্যাসকট। প্রতিবছর সেখানে শেখ মোহাম্মদকে দেখা যায় ব্রিটেনের রাণীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে।
হাইকোর্টের রায়ের পর বিশ্ব জানতে পারলো, শেখ মোহাম্মদের দুই কন্যা যখন পরিবার ছেড়ে পালাতে চেয়েছিল তখন কীভাবে তিনি তাদের অপহরণের পর অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন।
লন্ডনের হাইকোর্টের বিচারক শেখ মোহাম্মদের বিরুদ্ধে রায়ে আরও বলেছিলেন, তিনি তার সাবেক স্ত্রীকে ভয় দেখানো এবং হয়রানির জন্য অনেক চেষ্টা চালিয়েছেন। প্রিন্সেস হায়া এরপর গত বছর তার সন্তানদের নিয়ে ব্রিটেনে পালিয়ে আসেন। তিনি বলেছিলেন, তিনি তার জীবন নিয়ে শংকিত।
প্রিন্সেস হায়া গত বছর সন্তানদের নিয়ে লন্ডনে পালিয়ে আসেন
এই ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর সেটি বিশ্বে ঘোড়দৌড়ের জগতে বিরাট আলোড়ন তুলেছিল। তখন কেউ কেউ এমন দাবিও তুলেছিলেন, শেখ মোহাম্মদের সঙ্গে যেন সবাই সম্পর্ক ছিন্ন করেন।
ব্রিটেনের সঙ্গে ছয়টি উপসাগরীয় দেশের মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত সম্পর্ক সৌদি আরবের সঙ্গে। সৌদি বিচার ব্যবস্থা খুবই অস্বচ্ছ, স্বেচ্ছাচারী এবং সমালোচিত। সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বহু অভিযোগ উঠেছে। অ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো সংস্থা এরকম মানবাধিকার লঙ্ঘনের অনেক ঘটনার তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেছে।
কিন্তু ব্রিটিশ শাসনযন্ত্র পরিচালিত হয় যে হোয়াইটহল থেকে, সেখানকার নীতিনির্ধারকরা সৌদি আরবকে দেখেন ভিন্ন আলোকে। তারা মনে করেন মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব ঠেকাতে সৌদি আরবই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা প্রাচীর।
এছাড়া উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোতে কাজ করেন হাজার হাজার ব্রিটিশ নাগরিক। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে।
ইয়েমেনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সৌদি রাজকীয় বিমান বাহিনী যেসব হামলা চালিয়েছে, সেখানে তারা ব্যবহার করেছে ব্রিটেনের বিক্রি করা যুদ্ধ বিমান এবং বোমা। এই যুদ্ধ যে বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে তা জাতিসংঘের বিবেচনায় বিশ্বের সবচেয়ে গুরুতর মানবিক বিপর্যয়।
তবে যে ঘটনাটি বিশ্বকে সবচেয়ে বেশি ধাক্কা দিয়েছিল সেটি হচ্ছে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগজির হত্যাকান্ড। ২০১৮ সালের অক্টোবরে তাকে হত্যা করা হয়েছিল ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটের ভেতরে। হত্যার পর তার দেহ টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়। তার দেহাবশেষ এখনো পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি।
পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করে, এই ঘটনা সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের যোগসাজশে হয়েছে এমন সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। তবে তিনি একথা অস্বীকার করেছেন।
ছবির উৎস,GETTY IMAGES
ছবির ক্যাপশান,
জামাল খাশোগজি: সৌদি কনস্যুলেটের ভেতরে তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
গত জুলাই মাসে সৌদি আরব এই ঘটনার জন্য ২০ জন সৌদি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও সৌদি আরবের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্কে কোন ধরণের ছেদ ঘটতে দেখা যায়নি।
আকাশচুম্বী বিত্তের প্রভাব
এতরকম কেলেংকারি যে ব্রিটেনের সঙ্গে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে কোন বিরূপ প্রভাবই ফেলে না তার অনেক কারণ আছে। এই সম্পর্ক যেন সামনের দিনগুলোতে আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। যদি না হঠাৎ করে ব্রিটেন তার নীতি পুরোপুরি বদলে ফেলে।
মধ্যপ্রাচ্যে যে চলমান অস্থিতিশীলতা, যেখানে ইরান এবং ইসলামিক স্টেটকে ব্রিটেন তার জন্য নিরাপত্তা হুমকি বলে মনে করে, সেখানে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর রাজতন্ত্রকে দেখে তার প্র্রয়োজনীয় মিত্র হিসেবে।
ব্রিটেনের রাজকীয় বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমানগুলো নিয়মিত উপসাগরীয় বিমান ঘাঁটিগুলোতে উড়ে যায়। বাহরাইনে তো ব্রিটেনের একটি স্থায়ী নৌ ঘাঁটি আছে- এইচএমএস জুফাইর।
কাতারের সঙ্গে ব্রিটেনের টাইফুন যুদ্ধ বিমানের একটি যৌথ বহর আছে। ওমানও ব্রিটেনকে অনেক ধরণের সামরিক স্থাপনা ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে। ব্রিটেন সেগুলো ক্রমবর্ধমান হারে ব্যবহার করছে।
আর তেল এবং গ্যাস বিক্রির অর্থে উপসাগরীয় দেশগুলো যেরকম বিপুল বিত্তশালী হয়ে উঠেছে, সেই কারণতো আছেই।
এক সঙ্গে এই ছয়টি উপসাগরীয় দেশের যে বাজার, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে তারাই ব্রিটেনের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। এসব দেশ থেকে ব্রিটেনে বিনিয়োগ করা হয় শত শত কোটি পাউন্ড। সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি সংবাদপত্র 'দ্য ন্যাশনাল'কে দেয়া সাক্ষাৎকার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন স্বীকারও করেছেন, এই অঞ্চলটি ব্রিটেনের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
কাজেই এরকম একটা পরিস্থিতিতে নিশ্চিত করে দুটি জিনিস বলা যায়। প্রথমটা হচ্ছে, এরকম আরও অনেক ঘটনার কথা ফাঁস হতে থাকবে। আর দ্বিতীয়ত: উপসাগরীয় আরব দেশগুলো তাদের ভাবমূর্তি ঠিক রাখার জন্য যেসব পাবলিক রিলেশন্স কনসালট্যান্সি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেয়, আরও বহু বছর ধরে তারা ভালোই ব্যবসা করে যেতে পারবে।
ভারতের উত্তরপ্রদেশ কি ধর্ষণের মৃগয়া ক্ষেত্র হয়ে উঠছে?
মালবী গুপ্ত
সাংবাদিক, কলকাতা
ছবির উৎস,মালবী গুপ্ত
ভারত যে ক্রমশ ধর্ষণের মৃগয়া ক্ষেত্র হয়ে উঠছে, তাতে বোধহয় আর সন্দেহের অবকাশ থাকছে না। এবং মনে হচ্ছে সেক্স ট্যুরইজম বা যৌন পর্যটনের মতো যদি লুকিয়ে চুরিয়ে এবার রেপ ট্যুরইজম বা ধর্ষণ পর্যটনও চালু হয়ে যায়, তাহলে ভারত বোধহয় হয়ে উঠবে পৃথিবীর অন্যতম গন্তব্য।
আর দেশের মধ্যে হয়তো উত্তরপ্রদেশই সেই পর্যটকদের, থুড়ি ধর্ষণকারীদের কাছে সব থেকে আকর্ষণীয় ও সবচেয়ে নিরাপদ বলে বিবেচ্য না হয়ে ওঠে। সে কথায় পরে আসছি।
আসলে মৃগয়ার কথা বলছিলাম না। প্রাচীন কালে রাজা রাজড়ারা তো প্রায়ই ঢাক ঢোল পিটিয়ে সপারিষদ মৃগয়া বা শিকারে যেতেন। তাঁদের কেউ কেউ লক্ষ্যবস্তুকে বিদ্ধ করে এবং তারপর তাকে হত্যা করে নিজের শৌর্য বীর্য প্রকাশ করতেন।
বহু আদিবাসী সমাজে পরাক্রম প্রদর্শনের এমন শিকার আজও অনুশীলিত হয়।
ছবির উৎস,SOPA IMAGES
ছবির ক্যাপশান,
ভারতের মুম্বাই শহরে দেশের বিভিন্ন স্থানে গোত্র-ভিত্তিক ধর্ষণের প্রতিবাদে বিক্ষোভ
যত দূর জানি শিকার মানব সমাজে শুরু হয়েছিল প্রায় ৩০ লক্ষ বছর আগে। আদিম যুগে যে শিকার ছিল মূলত খাদ্য হিসেবে মাংসের প্রয়োজন মেটাতে, সেই শিকারই এই আধুনিক সভ্যতাতেও বহাল তবিয়তেই টিকে আছে মাংসের পাশাপাশি অন্য চাহিদাও মেটাতে ।
এখন অবশ্য ভারত সহ বহু দেশেই অবৈধ বা বেআইনি হয়ে যাওয়ায়, শিকার চলে লুকিয়ে চুরিয়ে।
তবে তথাকথিত সভ্য সমাজে নারী ও শিশুকন্যাও কিন্তু এক শ্রেণীর লোকের শিকারই হয়ে উঠেছে। এবং তা আদৌ লুকিয়ে চুরিয়ে নয়। বরং বাড়ির মধ্যে, স্কুলে, পথে - ঘাটে, ক্ষেতে - খামারে, অফিসে, হাসপাতালে - প্রায় সর্বত্রই সেই মৃগয়া বা শিকার চলেছে।
বিশেষ করে দুর্বল ও প্রান্তিক মেয়েরাই যার লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।
শিকার করার উল্লাসে
দেখা যাচ্ছে কখনো প্রতিহিংসা চরিতার্থে, কখনো অন্যতর খিদে মেটাতে, কখনো শুধু শিকার করার উল্লাসে, আবার কখনো তাদের পায়ের তলায় দাবিয়ে রেখে নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য সেই শিকার অব্যাহত। যে শিকারে সনাতনী হাতিয়ারের বদলে ধর্ষণকেই আয়ুধ হিসেবে বেছে নিচ্ছে ওই শিকারিরা।
ছবির উৎস,HINDUSTAN TIMES
ছবির ক্যাপশান,
হাথরসে গণধর্ষণের প্রতিবাদের দিল্লিতে বিক্ষোভ।
ধর্ষণকারীদের শিকারি বলছি বটে, তবে বন্যপশু শিকারিদের থেকে অনেক অনেক গুণ বেশি নিষ্ঠুরতায়, সেইসব ধর্ষিতাদের তারা হত্যা করে। কখনো ভয়ঙ্কর অত্যাচারে অত্যাচারে অর্ধমৃত অবস্থায় তাদের ফেলে দিয়ে যায় কোনো মাঠে, প্রান্তরে।
এবং কখনো অ্যাসিড ছুঁড়ে মারা, চরম নিষ্ঠুরতার বলি সেই সব মৃতপ্রায় ধর্ষিতারা শেষ পর্যন্ত প্রাণে বাঁচলেও, আজীবন পরিবারে, সমাজে তাদের অপমান আর অসম্মানের বোঝা নিয়েই যেন বেঁচে থাকতে হয়।
আইনগত সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত
ভারতে নারী ও কন্যা শিশুদের সুরক্ষার জন্য বিবিধ আইন আছে। কিন্তু অপরাধীর সাজা প্রাপ্তির হার ২৭ থেকে ৩০ শতাংশ হওয়ায় বোঝা যায় ঘরে বাইরে সেই আইনগত সুরক্ষা থেকে তারা বেশিরভাগ সময় কেন বঞ্চিতই থেকে যায়।
বরং কোনো ভাবে যদি তারা সেই সুযোগের হাত ধরে অভিযুক্তদের শাস্তিকে সুনিশ্চিত করার চেষ্টাও করে, তাহলে তারা যাতে তাতে সফল হতে না পারে, সর্বতোভাবে সেই পথে বাধার প্রাচীর তুলে দেওয়ার চেষ্টা হয়। কী প্রশাসনিক স্তরে, কী রাজনৈতিক, কী সামাজিক স্তরেও।
ছবির উৎস,NURPHOTO
ছবির ক্যাপশান,
ধর্ষণের প্রতিবাদে কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে মশাল মিছিল।
একথা সত্য যে, সারা পৃথিবী জুড়েই ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের হার ক্রমবর্ধমান। এবং কম বেশি প্রায় ১০০ কোটি নারী ও শিশুকন্যা তার গোটা জীবনে কোনো না কোনো সময়ে সে নির্যাতনের শিকার হয়। কিন্তু ভারতে তা যেন বাড়তে বাড়তে ক্রমশ 'মহামারি'র পর্যায়ে চলে যাচ্ছে।
যদিও কোনও পরিসংখ্যানই এই সমস্যার গভীরতা উপলব্ধে যথেষ্ট নয়। কারণ ধর্ষণের নথিভুক্ত পরিসংখ্যানই এই ব্যাপারে রাজ্য বা দেশের অবস্থানকে নির্দেশ করে। কিন্তু ভারতে ধর্ষিতা মেয়েদের ঘটনা নথিভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রেই যে বিপুল ফাঁক থেকে যায়।
প্রাণনাশের ক্রমাগত হুমকি
অত্যাচারে প্রাণে বেঁচে যাওয়া ধর্ষিতারা স্থানীয় থানাগুলিতে এব্যাপারে অভিযোগ দায়ের করতে গেলে তারা প্রায়শই প্রত্যাখ্যাত হয়। কখনো কখনো আবার নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে নেওয়ার পরামর্শও তাদের দেওয়া হয়। তাছাড়া থাকে ধর্ষণকারীদের দেওয়া প্রাণ নাশের ক্রমাগত হুমকি।
সর্বোপরি পারিবারিক, সামাজিক অদৃশ্য চাপে, তথা লোক লজ্জার ভয়ে 'ধর্ষণ কলঙ্ক'র বোঝা মাথায় নিয়ে ধর্ষিতা শেষাবধি থানার দরজা অবধি আর পৌঁছতেই পারে না। ভারতে অসংখ্য ধর্ষণ ঘটনা এভাবেই তাই অনথিভূক্ত থেকে যায়।
ছবির উৎস,GETTY IMAGES
ছবির ক্যাপশান,
উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ: ভারতে নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ তালিকার শীর্ষে রয়েছে তার রাজ্য।
উত্তরপ্রদেশের কথা
এবার উত্তরপ্রদেশের কথায় আসি। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর 'ক্রাইম ইন ইন্ডিয়া' ২০১৯ রিপোর্ট বলছে দেশে মেয়েদের প্রতি সংঘটিত অপরাধে উত্তরপ্রদেশ রয়েছে শীর্ষে। গড়ে দিনে ৮৭ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। কন্যা শিশুর প্রতি অপরাধেও শীর্ষে রয়েছে রাজ্যটি। আরও জানতে এখানে ক্লিক করুন।
অতি সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশের হাথরাসে সংঘটিত গণধর্ষণ ও নৃশংস অত্যাচারে ১৯ বছরের এক দলিত তরুণীর মৃত্যুর অভিযোগে প্রায় নির্ভয়া হত্যার প্রতিবাদের মতোই উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা দেশ । উন্নাও সহ হাথরাসের আগে ও পরে আরও বেশ কিছু ধর্ষিতার ওপর নৃশংস অত্যাচার ও হত্যার ঘটনা যেভাবে ঘটেই চলেছে, তাতে ধর্ষণকারীরা যে ক্রমশই রাজ্যে অকুতোভয় হয়ে উঠছে তাতে আর সন্দেহ কি?
দেখা যাচ্ছে শুধু সেপ্টেম্বরেই উত্তরপ্রদেশে ধর্ষণের ৯টি ঘটনা ঘটেছে যার মধ্যে ৮ বছরের শিশুকন্যা থেকে ৭০ বছরের বৃদ্ধাও আছেন। আরও জানতে ক্লিক করুন এখানে।
'কোনো ধর্ষণ হয়নি'
এই ধর্ষণের ঘটনাকে লঘু করতেই কি এখন আবার 'বিদেশি চক্রান্ত'র নতুন তত্ত্বও খাড়া করা হচ্ছে? যেমন, হাথরাস-এ 'কোনো ধর্ষণ হয়নি'। রাজ্য পুলিশের এডিজি (আইনশৃঙ্খলা)ও স্বয়ং দাবি করেছেন, হাথরাসের ঘটনা যোগী সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার 'আন্তর্জাতিক চক্রান্ত' (আনন্দবাজার পত্রিকা)।
ছবির উৎস,GETTY IMAGES
ছবির ক্যাপশান,
উত্তরপ্রদেশের পুলিশ বিরোধী কংগ্রেস দলের নেতা রাহুল গান্ধীকেও হাথরাসে ঢুকতে দেয়নি।
তদন্ত শেষ না হলেও এডিজি কি করে জানলেন ধর্ষণ হয়নি - এই প্রশ্ন তাকে ছুঁড়ে দিয়েছেন এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি। কিন্তু তাতে কি আসে যায়? উত্তর প্রদেশের অভিযুক্ত ধর্ষণকারীদের কাছে আসল বার্তাটি তো রাজ্য প্রশাসন পৌঁছেই দিল - যে, কোনো ভয় নেই।
নিরপরাধীকে নয়, অপরাধীদের কীভাবে সর্বস্তরে সুরক্ষা দেওয়া হয় - ভিকটিমকে হত্যা করে, পুড়িয়ে ফেলে অপরাধের সমস্ত প্রমাণ লোপাট করা, পরিবারের লোকজন, সাক্ষী, এমনকি ভিকটিমের হয়ে মামলায় লড়া আইনজীবীকেও হত্যার হুমকি দিয়ে - উত্তরপ্রদেশে উন্নাও সহ একের পর এক ঘটে চলা ঘটনায় যেন তারই প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠছে।
তাই বলছিলাম, এমন প্রশাসনিক অভয় পেলে এবং এক অদৃশ্য হাতের অমন সুরক্ষা বলয় তাদের মাথার ওপর থাকলে, ভবিষ্যতে ধর্ষণকারীদের কাছে উত্তরপ্রদেশ যে নিরাপদ ধর্ষণের মৃগয়া ক্ষেত্র হিসেবে আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠবে না, তা কে বলতে পারে?
নবীর অবমাননা: কার্টুন দেখানো শিক্ষকের শিরশ্ছেদ নিয়ে উত্তাল ‘ধর্মনিরপেক্ষ‘ ফ্রান্স
শাকিল আনোয়ার
বিবিসি বাংলা
ছবির উৎস,GETTY
ছবির ক্যাপশান,
প্যারিসে শিক্ষক হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফরাসী পাতাকার ওপর স্লোগান ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা‘
ক্লাসে মত প্রকাশের স্বাধীনতা শেখাতে ইসলামের নবীর কার্টুন দেখানোর পর থেকে হুমকির ভেতরে ছিলেন প্যারিসের উপকণ্ঠে এক স্কুলের ইতিহাস ও ভূগোলের শিক্ষক স্যামুয়েল প্যাটি।
কিছু মুসলিম অভিভাবক তাকে অপসারণের জন্য আন্দোলন করছিলেন। স্থানীয় একজন ইমামের নেতৃত্বে অনলাইনে এই নিয়ে প্রচারণাও চলছিল।
পুলিশের ভাষ্যমতে, সন্দেহভাজন ঐ হত্যাকারী মুসলিম তরুণ ৬০ মাইল দূরের এক শহর থেকে এসে ঐ শিক্ষককে খুঁজে বের করে ছুরি দিয়ে হত্যার পর তার শিরশ্ছেদ করে।
প্যারিসের কাছে শুক্রবার দিনে-দুপুরে এক স্কুল শিক্ষকের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড নিয়ে ফ্রান্সে গত কয়েকদিন ধরে যে ক্ষোভ এবং আবেগের যে বিস্ফোরণ দেখা যাচ্ছে, তার নজির সেদেশে বিরল।
শনিবার ও রোববার প্যারিসসহ ফ্রান্সের সমস্ত বড় বড় শহরে লাখ লাখ মানুষ ‘আমি ড্যানিয়েল প্যাটি‘ বা ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করতেই হবে‘ এমন সব প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন। আজ (বুধবার) রাষ্ট্রীয়ভাবে নিহত ঐ শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে।
ছবির উৎস,AFP
ছবির ক্যাপশান,
স্যামুয়েল প্যাটি জনপ্রিয় একজন শিক্ষক ছিলেন (ফাইল ফটো)
দু'হাজার পনের সালে ইসলামের নবীর কার্টুন প্রকাশের পর ব্যঙ্গাত্মক সাময়িকী শার্লি এব্দোর অফিসে ১২ জনের মৃত্যুর ঘটনার পর যে ক্ষোভ দেখা গিয়েছিল তার সাথে গত ক'দিনের বিক্ষোভের তুলনা করা হচ্ছে।
শুক্রবারই পুলিশের গুলিতে প্রধান সন্দেহভাজন আব্দুলাখ এ নামে ১৮ বছরের এক তরুণ পুলিশের গুলিতে মারা যায়। চেচেন বংশোদ্ভূত মুসলিম এই তরুণের বাবাসহ আরো ১৪ জনকে আটক করা হয়েছে।
বাড়ছে বিভেদের ফাটল
প্যারিসে বিবিসির সংবাদদাতা লুসি উইলিয়ামসন বলছেন, শিক্ষক স্যামুয়েল প্যাটির নৃশংস হত্যাকাণ্ড ফরাসী রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচিতি বা সত্ত্বা নিয়ে বিভেদ-বিতর্ক আরো তীব্র করে তুলেছে।
ছবির উৎস,GETTY
ছবির ক্যাপশান,
ফরাসী পার্লামেন্ট চত্বরে নিহত শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন এমপিরা
বিবিসির সংবাদদাতা বলছেন, এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে জাতীয় ঐক্যের বিরল এবং ‘নাটকীয় প্রদর্শন‘ দেখা গেলেও, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে ফরাসী সমাজের কিছু অংশের ভেতর আপত্তি তীব্র হচ্ছে।
রোববার ফরাসী একটি রেডিওতে ফাতিহা আগাদ বোঝালাত নামে মুসলিম এক ইতিহাসের শিক্ষক বলেন, “গত বছর এক ছাত্র আমাকে খোলাখুলি বলে যে নবীকে কেউ অশ্রদ্ধা করলে তাকে হত্যা করা পুরোপুরি বৈধ।“ ঐ শিক্ষক বলেন, “পরিবারের ভেতর যা শোনে, তার ভিত্তিতেই তাদের এ ধরণের মনোবৃত্তি তৈরি হয়।“
ফাতিহা বলেন, তিনি নিজেও গত কয়েক বছর ধরে মত প্রকাশের স্বাধীনতা শেখাতে ক্লাসে নবীর কার্টুন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের কার্টুন, ইমানুয়েল ম্যাঁক্রর কার্টুন দেখিয়েছেন।
ছবির উৎস,GETTY IMAGES
ছবির ক্যাপশান,
শিক্ষক হত্যাকাণ্ডে বিক্ষোভে মুখর ফ্রান্স।
তিনি নিজে বড় কোনো হুমকিতে না পড়লেও, অনেক শিক্ষকই বেশ কিছুদিন ধরে বলছেন, ক্ষুদ্র হলেও স্কুলে শিক্ষার্থীদের একটি অংশের ভেতর ফরাসী আইন এবং মূল্যবোধ নিয়ে আপত্তি-ক্ষোভ জোরালো হচ্ছে।
ধর্মনিরপেক্ষতা - ফরাসি ভাষায় যাকে বলে ‘লাইসিতে‘ -- তা ফ্রান্সের জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ফরাসী বিপ্লবের পর থেকেই “মুক্তি, সাম্য এবং ভ্রাতৃত্ব“ ফরাসী রাষ্ট্রের মূলমন্ত্র, কিন্তু লাইসিতে বা ধর্মনিরপেক্ষতাও সমান গুরুত্ব পায় সেদেশে।
লাইসিতের মূল কথা হলো জনসমক্ষে - তা ক্লাসরুম হোক বা কাজের জায়গায় হোক - সেখানে ধর্মের কোনো কথাই চলবে না। ফরাসী রাষ্ট্রের কথা - কোনো একটি জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভূতিকে রক্ষার জন্য মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ চাপালে জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট হবে।
কিন্তু এই তত্ত্ব যে অনেক নাগরিক এখন মানতে চাইছে না তার বহু প্রমাণ দিনকে দিন স্পষ্ট হচ্ছে। তারা দাবি করছে - ধর্মনিরপেক্ষতার পরিধি কমাতে হবে এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতায় রাশ টানতে হবে।
আমেরিকার নির্বাচন ২০২০: জো বাইডেনের ছেলে হান্টার বাইডেন চীন ও ইউক্রেনে কি করছিলেন?
বেশ কিছুদিন ধরেই ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে টার্গেট করেছেন জো বাইডেনের ছেলে হান্টার বাইডেনকে।
মি. ট্রাম্পের অভিযোগ - ওবামা প্রশাসনে ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকার সময় ইউক্রেন এবং চীনে ছেলের ব্যবসায়িক স্বার্থে অবৈধভাবে প্রভাব খাটিয়েছিলেন জো. বাইডেন। মি বাইডেন সবসময় জোরালো ভাষায় এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
মার্কিন পত্রিকা নিউ ইয়র্ক পোস্টে সম্প্রতি একটি ইমেল নিয়ে এক প্রতিবেদন ছাপার পর বিষয়টি আবারো নতুন করে সামনে এসেছে।
কথিত ঐ ইমেলটি ইউক্রেনের একটি জ্বালানি কোম্পানির তৎকালীন একজন কর্মকর্তা হান্টার বাইডেনকে পাঠিয়েছিলেন, যেখানে তার বাবার সাথে সাক্ষাতের আমন্ত্রণ জানানোর জন্য ঐ কর্মকর্তা মি. বাইডেনের ছেলেকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
এই খবর সম্পর্কে একজন সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করলে, জো বাইডেন উত্তর দেন, এটি “চরিত্র হরণে মিথ্যা প্রচারণা'' ছাড়া আর কিছুই নয়।
ব্যবসায়িক স্বার্থে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ ওয়াশিংটনে নতুন কিছু নয়। মি. ট্রাম্পের ছেলে-মেয়েদের নানা ব্যবসায়িক চুক্তির সাথেও স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠেছে। তারাও সবসময় তা জোর গলায় অস্বীকার করেন।
নিউ ইয়র্ক পোস্ট কী বলেছে?
নিউ ইয়র্ক পোস্টের ঐ রিপোর্টটি প্রধানত ২০১৫ সালের এপ্রিলের একটি ইমেল নিয়ে যেখানে ইউক্রেনের বেসরকারি জ্বালানি কোম্পানি বুরিজমা'র একজন উপদেষ্টা তাকে তার বাবার সাথে সাক্ষাতের জন্য ওয়াশিংটনে আমন্ত্রণ জানানোয় হান্টার বাইডেনকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
জো বাইডেন তখন বারাক ওবামা সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং তার দ্বিতীয় সন্তান হান্টার সেসময় বুরিজমা'র পরিচালনা বোর্ডের একজন সদস্য। তিনি ছাড়াও আরও কয়েকজন বিদেশী সেসময় বুরিজমার পরিচালনা বোর্ডে ছিলেন।
তবে বুরিজমার ঐ উপদেষ্টার সাথে জো বাইডেনের আদৌ কোনো সাক্ষাৎ হয়েছিল কিনা, সে ব্যাপারে নিউ ইয়র্ক পোস্ট কোনো প্রমাণ হাজির করেনি।
জো বাইডেনের নির্বাচনী প্রচারণা দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, সে সময় ভাইস প্রেসিডেন্টের ‘সরকারি কর্মসূচিতে' তেমন কোনো বৈঠকের কোনো উল্লেখ বা প্রমাণ নেই।
রাজতন্ত্র-বিরোধী বিক্ষোভ: থাইল্যান্ডের প্রতিটি পরিবার এখন যে ইস্যুতে বিভক্ত
ছবির উৎস,worldnewsm75
ছবির ক্যাপশান,
রাজতন্ত্রের প্রশ্নে প্রতিটি পরিবারে এখন চলছে দ্বন্দ্ব। পিতা-পুত্রের সম্পর্কে তৈরি হচ্ছে তিক্ততা।
"আমার বাবা আমাকে শিখিয়েছিলেন রাজার সমালোচনা করা পাপ। এটি নিষিদ্ধ।"
কিন্তু ১৯ বছর বয়সী ডানাই এখন তার বাবার এই হুঁশিয়ারি মানছেন না। ডানাই ব্যাংককে থাকেন, আইনের ছাত্র।
গত কয়েক মাস ধরে ব্যাংককে যে হাজার হাজার মানুষ রাজতন্ত্রের সংস্কারের দাবিতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছে, ডানাই তাদের একজন।
ডানাইর বাবা পাকর্ন উচ্চ মধ্যবিত্ত। তিনি অনেক দেশ ঘুরেছেন। এই লেখায় এদের দুজনের বেলাতেই ছদ্মনাম ব্যবহার করা হচ্ছে তাদের পরিচয় গোপন রাখার জন্য।
এরা দুজন যদিও একই বাড়িতে থাকেন না, তারপরও দুজনের মধ্যে নিয়মিত দেখা হয়। কিন্তু যতবারই তারা মুখোমুখি হন, একটি বিষয় নিয়ে আলাপ তারা এড়িয়ে যান, সেটি হচ্ছে 'রাজতন্ত্র।'
"যদি আমরা এটি নিয়ে কথা বলি, আমাদের মধ্যে তর্ক শুরু হয়ে যাবে। তারপর দিনটাই মাটি হবে", বলছেন ডানাই।
"একবার গাড়িতে বসে আমাদের মধ্যে তর্ক শুরু হয়েছিল আমি রাজার সমালোচনা করার পর। আমার বাবার কাছে রাজা হচ্ছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে, আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন? তখন তিনি বলেছিলেন, আমার বয়স অনেক কম, আমি বুঝবো না। তিনি বেশ রেগে গিয়েছিলেন। তারপর তিনি চুপ মেরে গেলেন। আমার সঙ্গে আর কথা বলছিলেন না।"
ডানাই এর পরিবার একা নয়। এরকম ঘটনা ঘটছে এখন থাইল্যান্ডের শহরে, গ্রামে- সর্বত্র, ঘরে ঘরে। থাইল্যান্ডে রাজতন্ত্রকে গণ্য করা হয় অত্যন্ত পবিত্র, অলঙ্ঘ্য এক প্রতিষ্ঠান হিসেবে।
অনলাইনে বিতন্ডা
রাজতন্ত্র নিয়ে এরকম বিতর্ক যে কেবল সামনা-সামনি চলছে তা নয়, এটি ঘটছে অনলাইনে, সোশ্যাল মিডিয়াতেও।
sm75
ছবির ক্যাপশান,
রাজতন্ত্র নিয়ে এরকম বিতর্ক কেবল সামনা-সামনি নয়, এটি ঘটছে অনলাইনে, সোশ্যাল মিডিয়াতেও।
এই বিতর্ক বেশ চরমেও চলে যাচ্ছে।
গত মাসে থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলীয় চিয়াং মাই শহরের এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী ফেসবুকে জানালো রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কারণে তাঁর বাবা তার বিরুদ্ধে মামলা করতে চেয়েছে। তখন মেয়েটির বাবা এর পাল্টা জবাব দিয়ে বললো, সে যেন আর পারিবারিক উপাধি ব্যবহার না করে।
পাকর্ন তার ছেলের আচরণের জন্য দায়ী করছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের।
"থাই সমাজে কিছু কট্টরপন্থী গোষ্ঠী আছে, যারা রাজতন্ত্র বিরোধী। এর পাশাপাশি ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়া অনবরত মিথ্যে এবং বিভ্রান্তিকর খবর ছড়িয়ে যাচ্ছে। তরুণরা কোন বাছ-বিচার না করে এসব গিলছে," বলছেন তিনি।
ডানাই তার বাবাকে রাজতন্ত্রের বিষয়ে প্রথম চ্যালেঞ্জ করেন ১৭ বছর বয়সে।
"আমরা সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। ছবি শুরু হওয়ার আগে, যখন নিয়মমাফিক রাজকীয় সঙ্গীত বাজছিল, সবাই উঠে দাঁড়ালো রাজার প্রতি সন্মান দেখাতে। আমি এটা করতে চাইনি, কাজেই আমি আমার সীটে বসে রইলাম। আমার বাবা আমাকে উঠে দাঁড়াতে জোরাজুরি করছিলেন। কিন্তু আমি দাঁড়াচ্ছিলাম না। যখন লোকজন আমাদের দিকে তাকাতে শুরু করলো, তখন আমি শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে দাঁড়ালাম।"
থাইল্যান্ডে রাজকীয় সঙ্গীত বাজার সময় কেউ উঠে দাঁড়াতে অস্বীকৃতি জানানো বেআইনি ছিল। তবে ২০১০ সালে আইনটি সংশোধন করা হয়। তবে এখনো কেউ এই কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে সেটিকে রাজতন্ত্রের প্রতি অশ্রদ্ধার প্রকাশ বলে গণ্য করেন অনেকে।
ঐতিহাসিক রীতি
জন্মের পর থেকেই থাইল্যান্ডের মানুষকে শেখানো হয় রাজাকে শ্রদ্ধা করতে, ভালোবাসতে। একই সঙ্গে রাজার বিরুদ্ধে কিছু বললে কী পরিণতি হতে পারে, সেটা নিয়ে ভয়ও তৈরি করা হয়।
থাইল্যান্ড পরিচিত সদাহাস্যময় মানুষের দেশ বলে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি হচ্ছে সেই গুটিকয় দেশের একটি, যেখানে রাজার অবমাননা অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। রাজা বা রাণীর বা রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারীর কোনরকম সমালোচনা করা বেআইনি। এর জন্য ১৫ বছর পর্যন্ত সাজা হতে পারে।
এখন অবশ্য সিনেমায় গিয়ে ডানাই আর রাজকীয় সঙ্গীতের সময় উঠে দাঁড়ান না।
গত জুলাই মাস হতে হাজার হাজার বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-ছাত্রী রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছে। থাইল্যান্ডে জরুরী অবস্থা জারি এবং এই বিক্ষোভের অনেক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু তাতে বিক্ষোভ থামেনি।
ছবির উৎস,worldnewsm75
ছবির ক্যাপশান,
জেল-জুলুমের ভয় উপেক্ষা করে নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে
থাইল্যান্ডের রাজার অসীম ক্ষমতা খর্ব করার দাবি জানাচ্ছে তারা, রাজার জন্য জনগণের অর্থ ব্যয়েরও সীমা বেঁধে দিতে চায় তারা।
বিশ্বের অন্য অনেক দেশে এসব দাবি সেরকম বড় কিছু নয় বলে মনে হতে পারে, থাইল্যান্ডের আধুনিক ইতিহাসে রাজাকে এরকম প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করার উদাহারণ আর নেই।
ছাত্রদের এই বিক্ষোভে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে থাইল্যান্ডের বেশিরভাগ মানুষ। ডানাইর পিতা পাকর্ন তাদের একজন।
"আমার জন্ম রাজা নবম রামার শাসনকালে। তিনি নিজের সন্তানদের চাইতে তার প্রজাদের জন্য বেশি করেছেন। যখন তিনি অসুস্থ হলেন, আমি তার সুস্থতার জন্য নিজে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে রাজী ছিলাম, যদি তাতেও রাজা দীর্ঘায়ু হন। কিন্তু আজকের প্রজন্ম, আমার ছেলে, তাদের সেই অভিজ্ঞতা নেই।"
এক নতুন রাজা
মাত্র কয়েক বছর আগেও দুই প্রজন্মের এই সংঘাত অকল্পনীয় ছিল। কিন্তু যখন রাজা মাহা ভাজিরালংকর্ন সিংহাসনে বসলেন, সবকিছু বদলে গেল।
নতুন রাজাকে প্রকাশ্যে খুব কমই দেখা যায়। তিনি বেশিরভাগ সময় কাটান জার্মানিতে। থাইল্যান্ডে করোনাভাইরাস মহামারি শুরু হওয়ার পর তিনি এখন জার্মানিতে আরও বেশি থাকছেন।
ব্যাংককে থাই সামরিক বাহিনীর যত ইউনিট আছে, তিনি তার সবগুলোতে অধিনায়কত্বে নিয়েছেন। এটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। থাইল্যান্ডের সাম্প্রতিক ইতিহাসে একজন রাজা এভাবে সামরিক শক্তি কুক্ষিগত করছেন, এমন নজির নেই।
ছবির উৎwo
ছবির ক্যাপশান,
রাজা ভাজিরালংকর্নের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে
তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও অনেক কথা হচ্ছে। তিনি তিনবার বিয়ে বিচ্ছেদের পর গত বছর আবার চতুর্থবারের মতো বিয়ে করেছেন।তার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী ছিলেন এমন এক নারীকে তিনি তার সঙ্গী হিসেবে মর্যাদা দিয়েছেন।
রাজা মাহা ভাজিরালংকর্নের তুলনায় প্রয়াত রাজা নবম রামাকে অনেকে প্রায় দেবতাতুল্য মনে করতেন। তিনি যেখানেই যেতেন, লোকজন তার জন্য মাটিতে শুয়ে পড়ে বলতো, আমরা রাজার পায়ের নীচের ধূলা। প্রয়াত রাজাকে দুবার সামনা-সামনি দেখার সুযোগ হয়েছিল পাকর্নের।
"একবার আমি যখন আমার গাড়িতে, তখন দেখলাম রাজা নিজে গাড়ি চালিয়ে আসছেন আমার উল্টো দিক থেকে। তার আগে-পিছে কোন গাড়িবহর নেই, কোন সাইরেনের আওয়াজ নেই। আমাদের মধ্যে চোখাচোখি হলো। আমি তো রীতিমত অবাক। তিনি আসলে অন্য সবার মতো সাধারণ কিছু করতে চেয়েছিলেন, খুব সহজ এবং অনানুষ্ঠানিক কিছু। আমার মনে হয়েছিল তাকে ঘিরে যেন একটা আভা আছে, তার উপস্থিতির একটা বিশেষ মূল্য ছিল।"
কিন্তু রাজা নবম রামা তার জীবনের শেষ দশ বছর ছিলেন অসুস্থ। বেশিরভাগ সময় তাকে হাসপাতালে কাটাতে হয়েছে।
ডানাইর মতো তরুণরা তাকে খুব কমই দেখেছেন। কিন্তু তারপরও যখন রাজা মারা গেলেন, ডানাই ফেসবুকে তার মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করে পোস্ট দিয়েছিলেন। রাজার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন।
তবে ডানাই বিবিসিকে এখন বলছেন, ফেসবুকে এরকম পোস্ট দেয়ার জন্য এখন তিনি অনুতাপ করেন।
"এখন আমি আসলে বুঝতে পারি, তার সম্পর্ক তখন বা তার আগে আমাদের যা বলা হয়েছিল, তা ছিল একেবারে প্রপাগান্ডা।
অতীত নিয়ে প্রশ্ন
রাজার ব্যাপারে তার বাবার যে অনুভুতি, সেটা মোটেই বুঝতে পারেন না ডানাই।
"রাজতন্ত্রের প্রতি তার যে ভালোবাসা, সেটা তাকে অন্ধ করে রেখেছে। তার সঙ্গে কথা বলা মানে একটা দেয়ালের সঙ্গে কথা বলা। তিনি কোন কিছু শুনতে চান না। এখন আমি বাবার কাছ থেকে একটা জিনিসই চাই, যাতে তিনি এই ব্যাপারটা নিয়ে খোলা মনে কথা বলেন, যেমনটি তিনি অন্য যে কোন বিষয়ে করেন।"
ডানাই এর ধারণা তার মা যদিও রাজতন্ত্রপন্থী, তারপরও তিনি তার বাবার মত অত জোরালোভাবে রাজতন্ত্রের সমর্থক নন। তবে তিনি কখনো রাজতন্ত্রের সমালোচনা করেননি এবং এই প্রতিবাদ ব্যর্থ হবে বলে মনে করেন তিনি।
ছবির উৎস,worldnewsm75
ছবির ক্যাপশান,
এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাংককের বাইরেও
ডানাই বলেন, "আমার মা মনে করেন রাজতন্ত্র সংস্কারের উর্ধ্বে এবং প্রতিবাদকারীরা এই কাজ করতে পারবে না।"
পাকর্ন বলছেন, তিনি জানেন না বয়স বাড়লে এবং প্রজ্ঞা বাড়লে ভবিষ্যতে তাঁর ছেলে আবার তার কাছাকাছি আসবে কীনা। আগে তারা দুজন যেরকম একই পথে ছিলেন, আবার সেরকম জায়গায় ফিরে আসতে পারবেন কীনা।
ডানাই নিজেও এ ব্যাপারে নিশ্চিত নন।
"এটা হয়তো হতে পারে যে এ ব্যাপারে আমি আমার মত বদলাতে পারি। কিন্তু বয়স বাড়ার কারণেই এটা ঘটবে, তা আমি মনে করি না।এটা নির্ভর করবে বাস্তবে কী ঘটে এবং আমি কী ধরণের তথ্য পাই, তার উপর।"
রাজতন্ত্র নিয়ে পরস্পরবিরোধী মতের জন্য পিতা-পুত্রের সম্পর্কে যে এরকম তিক্ততা তৈরি হয়েছে , তা আসলে থাই সমাজে দুটি প্রজন্মের মধ্যে বিরাট ব্যবধানেরই প্রতিফলন।
ছাত্র-ছাত্রীদের বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থাইল্যান্ডের সর্বত্র এভাবেই পরিবারগুলো ক্রমশ বিভক্ত হয়ে পড়েছে। পিতামাতা এবং সন্তান, ভাই এবং বোন, খালা এবং ভাগ্নে- সবাই যেন পরস্পরের কাছে অচেনা লোকে পরিণত হচ্ছেন।
তরুণ প্রজন্ম রাজতন্ত্র এবং এর প্রতিনিধিত্বকারী সবকিছুকেই প্রশ্ন করতে শুরু করেছে। এবং এটি এক দীর্ঘ আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের শুরু বলেই মনে হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচন ২০২০ : কীভাবে এখনো জিতে যেতে পারেন ডোনাল্ড ট্রাম্প
এ্যান্টনি যুরকার
উত্তর আমেরিকা সংবাদদাতা
ছবির উৎস,GETTY IMAGES
ছবির ক্যাপশান,
"আরো চার বছর" - ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারসভায় সমর্থকরা
যুক্তরাষ্ট্রে ভোটের দিন ঘনিয়ে এসেছে, আর মাত্র সপ্তাহ দুয়েক বাকি।
সম্প্রতি জনমত জরিপগুলোয় দেখা যাচ্ছে, ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন অব্যাহত ভাবে বেশ কিছু পয়েন্টের ব্যবধানে রিপাবলিকান ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে এগিয়ে আছেন।
শুধু যে জাতীয়ভাবে মার্কিন ভোটাররা কাকে বেশি পছন্দ করছেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে - সেই জরিপেই জো বাইডেন এগিয়ে আছেন তা নয়।
যেসব অঙ্গরাজ্যগুলোকে বলে ''সুইং স্টেট'' অর্থাৎ যারা একেক নির্বাচনে একেক প্রার্থীকে ভোট দিয়েছে বলে দেখা গেছে - সেগুলোতে চালানো জরিপেও দেখা যাচ্ছে জো বাইডেনই এগিয়ে।
ডেমোক্র্যাটরা এবার নির্বাচনী প্রচারাভিযানের জন্য যে বিপুল পরিমাণ চাঁদা তুলেছে - তা এক নতুন রেকর্ড। ফলে আর্থিক দিক থেকেও তারা সুবিধাজনক অবস্থায় আছে।
এর অর্থ হলো, ভোটের ঠিক আগের সপ্তাহগুলোয় জো বাইডেন তার প্রচারণা ও বার্তা দিয়ে রেডিও-টিভি ছেয়ে ফেলতে পারবেন।
''ট্রাম্প এবার পুননির্বাচিত হতে পারবেন না" - এমন অনুমানের পক্ষেই অধিকাংশ নির্বাচনী বিশ্লেষক এখন বাজি ধরছেন।
নেট সিলভারের ফাইভথার্টিএইট ডট কম ব্লগ এখন মনে করছে, বাইডেনের জয়ের সম্ভাবনা ৮৭ শতাংশ। অন্যদিকে ডিসিশন ডেস্ক এইচ কিউ বলছে, এ সম্ভাবনা ৮৩.৫ শতাংশ।
তবে ডেমোক্র্যাটরা এরকম অবস্থা আগেও দেখেছে - যারা পরিণতি হয়েছে আশাভঙ্গের বেদনায়।
ছবির ক্যাপশান,
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই প্রার্থী জো বাইডেন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প
চার বছর আগে, নির্বাচনের আগে এমন সময়টায় হিলারি ক্লিনটনেরও জয়ের উচ্চ সম্ভাবনা আছে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তার পর কি ঘটেছিল - তা মনে আছে তাদের।
ট্রাম্পের আরেকটি বিজয়ের মধ্যে দিয়ে কি সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে পারে?
জানুয়ারি মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার শপথ নিচ্ছেন - এই দৃশ্য যদি সত্যি দেখা যায়, তাহলে তার পাঁচটি সম্ভাব্য কারণ এখানে বলা হলো।
১. আরেকটি 'অক্টোবর বিস্ময়'
চার বছর আগে নির্বাচনের ঠিক ১১ দিন আগে - এফবিআইয়ের পরিচালক জেরেমি কোমি জানিয়েছিলেন, হিলারি ক্লিনটন পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় তার ব্যক্তিগত ইমেইল সার্ভার ব্যবহারের ঘটনাটির তদন্ত নতুন করে শুরু করছে তার প্রতিষ্ঠান।
এক সপ্তাহ ধরে এ ঘটনা এবং সম্পর্কিত বিষয়গুলো ছিল সংবাদ মাধ্যমে বড় খবর এবং তা ট্রাম্পের প্রচারাভিযানকে দম ফেলার একটা সুযোগ এনে দিয়েছিল।
এখন ২০২০এর নির্বাচনের আগে বড়জোর দু সপ্তাহ সময় আছে। যদি এখন সেই রকম রাজনৈতিক ভূমিকম্প ঘটানোর মত কোন কিছু ঘটে যায় - তাহলে সেটাই হয়তো ট্রাম্পকে বিজয় এনে দিতে পারে।
ছবির উৎস,GETTY IMAGES
ছবির ক্যাপশান,
জো বাইডেন (ডানে) এবং তার ছেলে হান্টার
এখন পর্যন্ত অবশ্য এ মাসের বড় চমক-লাগানো ঘটনাগুলো ট্রাম্পের বিপক্ষেই গেছে। যেমন: তার কর না দেয়া সংক্রান্ত খবর ফাঁস, এবং দু'নম্বর কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে তার হাসপাতালে ভর্তি হওয়া।
রক্ষণশীল শিবির অবশ্য অন্য একটি ঘটনাকে প্রচারাভিযানে কাঁপন ধরানোর মতো ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
নিউ ইয়র্ক পোস্ট পত্রিকা একটি রহস্যময় ল্যাপটপ এবং তাতে পাওয়া একটি ইমেইল নিয়ে এক নাটকীয় খবর প্রকাশ করেছে । এতে জো বাইডেনের সাথে তার পুত্র হান্টারের একটি ইউক্রেনিয়ান গ্যাস কোম্পানির লবিইং করার চেষ্টার সংশ্লিষ্টতা আছে বলে মনে হতে পারে।
কিন্তু এর উৎস প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় এবং সুনির্দিষ্ট কিছুর অভাবের কারণে মনে হয় এটা হয়তো খুব বেশি ভোটারের মত পরিবর্তন করতে পারবে না।
ট্রাম্প অবশ্য অঙ্গীকার করেছেন যে এটা শুরু মাত্র, আরো অনেক কিছু আসছে। যদি তাই হয়, এবং বাইডেন ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকার সময় কোন অন্যায় করার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায় - তাহলে তা একটা ভিন্ন এবং বড় ঘটনায় পরিণত হতে পারে।
অথবা এমনও হতে পারে যে - এই প্রচারাভিযানের মধ্যে সবাইকে হতবাক করার মত অকল্পনীয় আরেকটা কিছু খুব শিগগিরই ঘটবে।
এটা কী হবে তা যদি আমরা বলতে পারতাম - তাহলে তো কেউ এতে অবাক হবে না।
২. 'জনমত জরিপ সব ভুল'
মোটামুটি যেদিন থেকে জো বাইডেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হয়েছেন - সেদিন থেকেই জাতীয় জনমত জরিপগুলোয় তাকে ট্রাম্পের চাইতে এগিয়ে থাকতে দেখা গেছে।
এমনকি সুইং স্টেটগুলোতে - যেখানে দুই প্রার্থীর মধ্যে সমর্থনের ব্যবধান খুবই সামান্য - সেখানেও জো বাইডেনকে বরাবরই খানিকটা এগিয়ে থাকতে দেখা গেছে।
এসব জনমত জরিপে যেটুকু ভুলের সম্ভাবনা থাকতে পারে বলে ধরে নেয়া হয় - এই ব্যবধানটা তার চেয়েও বেশি।
আমেরিকান নির্বাচনে আসল লড়াই হয় 'সুইং স্টেট'গুলোয় - যাতে কোন দলেরই স্পষ্ট প্রাধান্য নেই
তবে ২০১৬ সালের নির্বাচনে দেখা গেছে, জাতীয় স্তরের জরিপগুলোয় কে এগিয়ে আছেন তা অপ্রাসঙ্গিক এবং অঙ্গরাজ্য-স্তরের জরিপেগুলোও ভুল হতে পারে।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কত লোক আসলে ভোট দিতে যাবেন -এর পূর্বাভাস দেয়া প্রতি নির্বাচনের আগেই জরিপকারীদের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
২০১৬র নির্বাচনে জরিপকারীরা এ ক্ষেত্রে ভুল করেছিল। তারা শ্বেতাঙ্গ এবং কলেজে-পড়েনি এমন ভোটারদের সংখ্যা কম ধরেছিল -যারা বেশি সংখ্যায় ট্রাম্পকে ভোট দেয়।
দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, বাইডেন এখন যে ব্যবধানে এগিয়ে আছেন - তাতে জরিপকারীরা ২০১৬র মত ভুল করলেও তিনি জিতে যাবেন।
তবে জরিপকারী সংস্থাগুলো বলছে, ২০২০ সালের নির্বাচনে তাদের কিছু নতুন বাধা অতিক্রম করতে হচ্ছে।
যেমন, বহু আমেরিকানই এই প্রথমবারের মতো ডাকযোগে ভোট দেবার পরিকল্পনা করছে। রিপাবলিকানরা ইতিমধ্যেই বলে দিয়েছে যে তারা ডাকযোগে দেয়া ভোটকে জোরালোভাবে চ্যালেঞ্জ করবে - কারণ তাদের মতে এখানে ব্যাপক হারে জালিয়াতি হবার সম্ভাবনা আছে, এবং এটা তাদের ঠেকাতে হবে।
ডেমোক্র্যাটরা বলছে, এটা আসলে ভোটারদের দমন করার একটা প্রয়াস।
ভোটাররা যদি তাদের ফর্মগুলো ভুলভাবে পূরণ করে অথবা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে, অথবা যদি ডাকযোগে ভোট পাঠানোর ক্ষেত্রে কোন বিঘ্ন বা বিলম্ব হয় - তাহলে এমন পরিস্থিতি হতে পারে যে সঠিকভাবে পূরণ করা ভোটও বাতিল হয়ে যেতে পারে।
ছবির উৎস,GETTY IMAGES
ছবির ক্যাপশান,
হোয়াইট হাউসে নতুন প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শুরু হবে ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে
ভোটকেন্দ্রগুলোর সংখ্যা যদি কম হয়, বা তাতে যদি কর্মকর্তা কম থাকে - তাহলে ৩রা নভেম্বর ভোট দিতে গিয়ে অনেকে অসুবিধায় পড়তে পারেন।
এতে হয়তো অনেক আমেরিকান - যাদের জনমত জরিপকারী সংস্থাগুলো সম্ভাব্য ভোটার হিসেবে চিহ্নিত করেছে - তারা হয়তো ভোট দিতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
৩. টিভি বিতর্কে যদি ট্রাম্প ভালো করেন
টিভিতে ট্রাম্প ও বাইডেনের প্রথম বিতর্ক নিয়ে হৈচৈ থেমে গেছে, কারণ দু সপ্তাহ সময় পার হয়ে গেছে। ওই বিতর্কে অবশ্য ট্রাম্পই ছিলেন সবচেয়ে আক্রমণাত্মক।
জনমত জরিপগুলোতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে ট্রাম্পের সেই আক্রমণাত্মক ভাব, বাইডেনের কথায় বার বার বাধা দেয়া শহরতলীগুলোতে থাকা মহিলাদের ভালো লাগেনি । এই নির্বাচনে তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে বাইডেন আক্রমণের মুখেও অবিচল ছিলেন, রিপাবলিকানরা ভোটারদের মনে বাইডেনের বয়স নিয়ে যে উদ্বেগ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল - সে উদ্বেগ কেটে গেছে।
ভিডিওর ক্যাপশান,
আমেরিকান নির্বাচন ২০২০: ট্রাম্প-বাইডেন প্রেসিডেন্ট বিতর্ক- বিশৃঙ্খল ও উত্তপ্ত
এখন ট্রাম্পের সামনে প্রথম বিতর্কে তৈরি হওয়া ধারণা পরিবর্তনের শেষ সুযোগ আসছে ২২শে অক্টোবর।
সেদিন যদি তিনি অপেক্ষাকৃত শান্ত এবং প্রেসিডেন্ট-সুলভ ভাব তুলে ধরতে পারেন, এবং বাইডেন যদি কোন নাটকীয় ভুল করে বসেন - তাহলে হয়তো এই প্রতিযোগিতার মোড় ঘুরে ট্রাম্পের পক্ষে চলে যেতে পারে।
৪. সুইং স্টেটগুলোতে বিজয়
যদিও জনমত জরিপগুলোর ফল বাইডেনের পক্ষে যাচ্ছে কিন্তু এমন অনেক অঙ্গরাজ্য আছে যেখানে ট্রাম্পই এগিয়ে আছেন, বা পিছিয়ে আছেন খুব সামান্য ব্যবধানে।
এখানে সামান্য এদিক-ওদিক হলেই হয়তো ইলেকটোরাল কলেজের ভোটগুলো ট্রাম্পের পক্ষে চলে আসতে পারে।
গত ২০১৬র নির্বাচনে যেমনটা হয়েছিল, জাতীয়ভাবে জনসাধারণের ভোট ট্রাম্প কম পেয়েছিলেন, কিন্তু ইলেকটোরাল কলেজের ভোটে ট্রাম্প পান হিলারি ক্লিনটনের চেয়ে অনেক বেশি।
ছবির উৎস,REUTERS
ছবির ক্যাপশান,
টিভি বিতর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেন
যেসব সুইং স্টেটে ট্রাম্প জিতেছিলেন - যেমন মিশিগান ও উইসকনসিন - সেগুলো এবার তার নাগালের বাইরে বলেই মনে হচ্ছে।
কিন্তু বাকিগুলোতে যদি ট্রাম্প সামান্য ব্যবধানেও জিতে যান, পেনসিলভানিয়া এবং ফ্লোরিডায় শ্বেতাঙ্গ কলেজে-না-পড়া ভোটারদের আরো বেশি সংখ্যায় ভোট কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারেন - তাহলে তিনি হয়তো ২৭০টি ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে জয় নিশ্চিত করে ফেলতে পারেন।
এমন একটা চিত্র্রও কেউ কেউ তুলে ধরছেন যে - ট্রাম্প এবং বাইডেন উভয়েই যদি ২৬৯টি করে ইলেকটোরাল ভোট পান, তাহলে এই 'টাই' অবস্থায় ফল নির্ধারিত হবে মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে রাজ্যের প্রতিনিধিদের দ্বারা।
সেক্ষেত্রে মনে করা হচ্ছে তাদের বেশির ভাগই ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দেবেন।
৫. বাইডেনের কোন ভুল
জো বাইডেন এ পর্যন্ত অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এক প্রচারাভিযান চালিয়েছেন।
হয়তো এটা পরিকল্পিতভাবেই করা হয়েছে বা করোনাভাইরাস মহামারি-জনিত বাস্তবতার কারণেই হয়েছে।
তবে বাইডেন এমন একজন প্রার্থী - যিনি কখনো কখনো বেফাঁস কথা বলে ফেলতে পারেন বলে মনে করা হয় । তার পরও তিনি এখন পর্যন্ত মোটামুটি মস্যা এড়িয়ে চলতে পেরেছেন, তার মুখের কথার কারণে কোন সমস্যায় পড়েননি।
তবে এখন বাইডেন জোরেশোরে প্রচারভিযানে নেমেছেন। যেহেতু তাকে অনেক বেশি সভাসমাবেশ হচ্ছে - তাই হঠাৎ করে কোন বেফাঁস কথা বলে ফেলার ঝুঁকিও বেড়ে গেছে।
ছবির ক্যাপশান,
নতুন প্রেসিডেন্ট দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন ২০২১ সালের জানুয়ারির ২০ তারিখে
জো বাইডেনের নির্বাচনী জোটে বহু ধরণের লোক আছে। এখানে শহরতলীর মধ্যপন্থীরা আছে, ক্ষুব্ধ রিপাবলিকানরা আছে, সংখ্যালঘুরা আছে, আরো আছে শ্রমজীবী ঐতিহ্যগত ডেমোক্র্যাটরা এবং উদারনৈতিকরা।
মি. বাইডেন যদি এদের কোন একটি গোষ্ঠীর অসন্তুষ্ট হবার মত কিছু করেন তাহলে তার সমর্থকদের মধ্যে ক্রোধ সৃষ্টি হতে পারে।
এমন সম্ভাবনাও আছে যে প্রচারাভিযান-জনিত ক্লান্তির কারণে জো বাইডেনের যে অনেক বয়স হয়েছে এটা দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে এবং তখন উদ্বেগ দেখা দেবে যে তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করার উপযুক্ত কিনা।
এরকম কিছু হলেই ট্রাম্পের প্রচারণা দল তার সুযোগ নিতে দ্বিধা করবে না।
বাইডেনের প্রচারাভিযান দল হয়তো মনে করছে, কোনমতে আর কয়েকটি দিন পার করে দিতে পারলেই হোয়াইট হাউস তাদের কব্জায় এসে যাবে।
কিন্তু এখন যদি তারা একটা হোঁচট খায়, তাহলে হয়তো এই রাজনৈতিক দলটি আরেকটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বসতে পারে যে কীভাবে 'নিশ্চিত জয়ের মুখ থেকে পরাজয় ছিনিয়ে নেয়া যায়
নাগোর্নো কারাবাখ যুদ্ধ: দুদিকেরই সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ,আপোষহীন
ছবির উৎস,GETTY
ছবির ক্যাপশান,
আজারবাইজানের গাঞ্জা শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন
নাগোর্নো-কারাবাখ যুদ্ধের ওপর তাদের সর্বশেষ বিবৃতিতে আজারবাইজান বলেছেন যে ঘাঁটি থেকে আর্মেনিয়া বেসামরিক এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ছিল, তা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। আজেরি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
নাগোর্নো কারাবাখ এখন আর্মেনীয়রা নিয়ন্ত্রণ করলেও এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আজেরি এলাকা। নাগোর্নো কারাবাখের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দশকের পর দশক ধরে চলা যে সংঘাত গত কয়েকবছর ধরে তুষের আগুনের মত দপদপ করছিল, তা হঠাৎ করে দাউদাউ করে জ্বলে উঠেছে। থামানোর কোনো চেষ্টাই কাজ করছে না।
আজারবাইজানের কথা হলো বিতর্কিত এই ভূখণ্ডের দখল তাদের অসমাপ্ত একটি কাজ। কিন্তু আর্মেনীয়দের দাবি ঐতিহাসিকভাবে শত শত বছর ধরে এই অঞ্চলটি তাদের।
বিবিসির সংবাদদাতা ওরলা গেরিন এবং স্টিভ রোজেনবার্গ গত কয়েকদিন দুই দিকের মানুষের মধ্যে পরস্পরের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ, অবিশ্বাস এবং শত্রুতার মনোভাব এবং দেশপ্রেম প্রত্যক্ষ করেছেন।
শোনা যাক সংবাদদাতাদের নিজের বয়ানে:
ওরলা গেরিন
আজারবাইজানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর গাঞ্জার গাছে ঢাকা প্রধান সড়টি সকালের রোদে ঝকঝক করলেও অসংখ্য কাঁচের টুকরায় ঢাকা। পাশের একটি অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে এমনভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে যে সেটিকে দুমড়ানো মুচড়ানো একটি টিনের ক্যানের মত লাগছে। ঐ ভবনের জানলার কাঁচ, লোহা এবং কাঠের টুকরোয় ভরে গেছে পাশের রাস্তা।
নাগোর্নো কারাবাখের ফ্রন্টলাইন বা রণাঙ্গন থেকে গাঞ্জার দূরত্ব ১০০ কিলোমিটারের মত, কিন্তু যুদ্ধবিরতির মধ্যেই রোববার এই শহরের বাসিন্দারা যুদ্ধের ভয়াবহতার নির্মম স্বাদ পেয়েছেন। ১০০ কিলোমিটার দূরত্বে থেকেও তারা রক্ষা পাননি।
ছবির ক্যাপশান,
গাঞ্জার বাসিন্দা নুশাবে হাইদারোভা বোমা থেকে কোনোভাবে প্রাণ বাঁচিয়েছেন
আজারবাইজান এই হামলার জন্য আর্মেনিয়াকে দায়ী করেছে। আর্মেনিয়া বলেছে আজারবাইজানও তাদের বেসামরিক এলাকায় হামলা করছে।
গাঞ্জায় দেখা হলো ৬০ বছরের নারী নুশাবে হাইদারোভার সাথে। মাথায় চাদর, পায়ে ঘরে পরার চপ্পল, রাতে শোয়ার পোশাকের ওপর একটি কার্ডিগান চাপানো। তার বাড়িতে হামলার ধাক্কা তিনি কাটিয়ে উঠতে পারছেন না।
“এই এক কাপড়ে আমি দৌড়ে বেরিয়ে এসেছিলাম, কোনোরকমে জান বেঁচেছে। ভয়াবহ ছিল ঐ সময়টা,'' তিনি আমাকে বলেন।
ধ্বংসস্তুপ ডিঙ্গিয়ে তার বাড়িতে ঢুকলাম। যে বেডরুমে তার নাতিরা শুয়ে ছিল, সেখানে গেলাম। অল্প জখম হলেও তারা প্রাণে বেঁচে গেছে। কিন্তু দুই প্রতিবেশী দেশের নতুন একটি প্রজন্ম এই দীর্ঘদিনের সংঘাতের প্রথম আঁচড় পেতে শুরু করেছে। যেমনটি পেয়েছিল তাদের পূর্ব প্রজন্ম। ঠিক যেন একই চিত্রের নতুন প্রদর্শন ।
“আর্মেনীয়দের মুখ বুজে (নাগোর্নো কারাবাখ) থেকে চলে যাওয়া উচিৎ। আমরা আমাদের মাতৃভূমিকে মুক্ত দেখতে চাই,'' বললেন ঐ নারী।
এখানকার মানুষ কারাবাখকে তাদের দেশ থেকে হারিয়ে যাওয়া একটি ভূখণ্ড হিসাবে দেখে। জাতীয়ভাবে এটি সর্বক্ষণ মানুষকে বলা হয়।
বাইশ বছরের তরুণ ইহতিয়ার রাসুলভ কখনই নিজে নাগোর্নো কারাবাখে পা রাখেননি। সুদর্শন এই আজেরি তরুণ বললেন, সেখানে যাওয়ার জন্য তিনি জীবন দিতেও প্রস্তুত। আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে তার সাথে যখন দেখা হয়, তার কিছুক্ষণ আগে তিনি যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য নাম লিখেয়ে এসেছেন।
“আমার জাতির জন্য, মাতৃভূমির জন্য রক্ত দিতে আমি প্রস্তুত,“ কণ্ঠে আবেগ নিয়ে বলেন ইহতিয়ার। “আমার পিতামহ, বাবা, মা সবাই সেখানে বাস করতেন। আমার বড়ভাই এখন যুদ্ধ করছে।''
৯০এর দশকে নাগোর্নো কারাবাখ যুদ্ধের সময় যে হাজার হাজার আজেরি পরিবার সেখানে থেকে পালিয়ে এসেছিল, ইহতিয়ারের পরিবার তাদেরই একটি। বাকুর একটি দরিদ্র এলাকায় একটি হাউজিং কমপ্লেক্সে পরিবারের সাথে থাকে সে।
ছোটো থেকেই পরিবারের গুরুজনদের কাছ থেকে সে কারাবাখের গল্প শুনছে, আর্মেনিয়ার সাথে যুদ্ধের ভয়াবহতার কথা শুনেছে, জন্মভূমি থেকে পরিবারের পালানোর করুণ কাহিনি শুনছে, আর্মেনিয়ার সাথে তাদের জাতির ঐতিহাসিক শত্রুতার কথা শুনেছে। ইহতিয়ারের মতো নতুন একটি আজেরি প্রজন্মের অনেকেরই একই কাহিনি।
ইহতিয়ারের স্পষ্ট কথা, “কারাবাখ আজারবাইজানের অংশ। আজেরিরা সেখানে জোর করে ঢুকে নানা সর্বনাশ করেছে। আমি চোখে দেখিনি, কিন্তু আমি অনেক শুনেছি।'' তিনি বলেন, আজেরি প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ যা বলছেন, তাতে তার আস্থা রয়েছে। রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণে থাকা এই দেশে এমন বিশ্বাসের কথা অনেকের মুখেই শোনা যাবে।
আলাপের সময় ইহতিয়ারের একজন প্রতিবেশী হঠাৎ দৌড়ে এসে আগেরবারের যুদ্ধের সময় পাওয়া তার পরিচয় পত্র দেখালেন। মধ্যবয়সী আসেফ আকবরদিয়েভর মাথায় এখন টাক পড়ে গেলেও খুবই চনমনে স্বভাবের তিনি। নাগোর্নো কারাবাখ নিয়ে আগের বারের যুদ্ধে তিনি লড়াই করেছিলেন।
তিনি আমাকে বললেন, “আমার বয়স এখন ৫১। তারপরও আমি দেশের জন্য যুদ্ধে প্রাণ দিতে প্রস্তুত। আমি আমার ছেলেকে যুদ্ধে পাঠিয়েছি। সে এখন সীমান্তে লড়াই করছে। আমার পরিবারের প্রতিটি সদস্যও যদি মারা যায়, দেশের এক ইঞ্চি জমিও ছাড়বো না।''
রণাঙ্গনে আজেরি গ্রাম টারটারেও একজন বৃদ্ধা নারীর কণ্ঠেও একই কথা শুনেছি।
ছবির ক্যাপশান,
স্টেপানাকার্ট শহরের একটি রাস্তায় দূরপাল্লার একটি ক্ষেপণাস্ত্রের খোসা
মাথার ওপর এবং চারদিকে যখন গোলার শব্দ, তখনও আইবেনিজ জাফারাভা বাড়ি ছেড়ে যেতে নারাজ। তাকে তার পরিবারের সাথে পেয়েছিলাম মাটির নিচে একটি আশ্রয়ে। কোলে ছয়মাসের নাতি ফারিজ। “২৮ বছর ধরে ধরে আমরা এর অপেক্ষায় ছিলাম,'' মুখে কিছুটা হাসি নিয়ে তিনি আমাকে বললেন। “যা হচ্ছে তা নিয়ে আমরা উচ্ছ্বসিত। আমার ছেলে এবং মেয়ে যুদ্ধ করছে। আমরা এই শেল্টারে বসে বিজয়ের অপেক্ষা করছি। তারপর আমরা আমাদের ফেলে আসা ভূমিতে ফিরে যাবো।''
রাশিয়ার মধ্যস্থতায় যে যুদ্ধবিরতির চুক্তি হয়েছিল তা যে টিকবে তেমন আশা কেউই করেনি। অনেকেই যুদ্ধ বিরতি চায়না। আজেরি সৈন্যরা ইতোমধ্যেই নাগোর্নো কারাবাখ সংলগ্ন কিছু এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিতে পরেছে। এখানকার মানুষ চায় প্রেসিডেন্ট যেন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
স্টিভেন রোজেনবার্গ
নাগোর্নো কারাবাখের প্রধান শহর স্টেপানাকার্টের কাছে পাহাড়ের ওপর তার বাড়িতে আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন আসোট আগিয়ানিয়ান। গোলার আঘাতে বিধ্বস্ত তার বাড়ির কিছুটা অংশ এখনও অবশিষ্ট রয়েছে। এখনো বাড়ি ছাড়েননি তিনি। বসার ঘরের মেঝেতে কাঁচের টুকরো এবং সিলিংয়ের ভেঙ্গে পড়া কংক্রিটের টুকরো পড়ে আছে। নতুন কেনা সোফা ছিঁড়ে ফেটে গেছে। রান্নাঘর আর বাথরুম পুরোই বিধ্বস্ত।
অসোটের বাড়িতে দূরপাল্লার একটি ক্ষেপণাস্ত্র এসে পড়েছিল, এবং তার বিশ্বাস আজারবাইজান থেকে এটি ছোড়া হয়েছে। বিস্ফোরিত ক্ষেপণাস্ত্রের কিছু টুকরো তার বাগানে চোখে পড়লো।
তিনি বললেন, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর এই ক্ষেপণাস্ত্র তার বাড়িতে আঘাত করে। ভাগ্য ভালো সে সময় তিনি এবং তার ছেলে মাটির নিচে সেলারে ছিলেন। ফলে প্রাণে বেঁচে গেছেন। কিন্তু যে বাড়ি তিনি নিজের হাতে বানিয়েছিলেন তা তছনছ হয়ে গেছে।
আর্মেনীয় এবং আজেরিরা কি কখন একসাথে শান্তিতে বসবাস করতে পারবে? আমার এই প্রশ্নে অসোট মাথা ঝাঁকিয়ে তিনি বললেন, “কখনই না।''
স্টেপানাকার্ট শহরে এখন দিনের ভেতর কয়েকবার বিমান হামলার আগাম সতর্ক দিতে সাইরেন বাজে। মানুষজন তখন দৌড়ে মাটির নিচে ঘরে বা ট্রেঞ্চে আশ্রয় নেন। বোমা থেকে বাঁচতে তাদের অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকের বেসমেন্টে আশ্রয় নেওয়ার সময় কানা-ফাটানো একটি শব্দ পান সের্গেই আভানিসিয়ান।
ছবির ক্যাপশান,
স্পেনাকার্টের কাছে এক আর্মেনীয় গ্রামের বাসিন্দা আসোট আগিয়ানিয়ান বিবিসিকে দেখাচ্ছেন কিভাবে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে তার বাড়ি মারাত্মকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে।
“পুরো ভবনটি কেঁপে উঠেছিল,'' বলেন সের্গেই। পরে উপরে উঠে দেখেন তার বাড়ির কয়েক মিটার দূরেই বিশাল একটি গর্ত। সামনের বাড়িটি ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। এত জোর ছিল সেই বিস্ফোরণ যে রাস্তার অ্যাসফল্ট উঠে তা বাতাসে উড়ে অনেক দূরে দূরে গিয়ে পড়েছে।
সের্গেই অভিযোগ করেন তুরস্ক এই সহিংসতায় উস্কানি দিচ্ছে। তুরস্ককে পাল্টা জবাব দিতে, নাগোর্নো কারাবাখের অনেকেই চাইছেন রাশিয়া যেন সরাসরি তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। তবে সের্গেই মনে করেন, সেটা হয়ত হবেনা।
“আমি ভ্লাদিমির পুতিনকে খুব সম্মান করতাম, কিন্তু তিনি বহুদিন আগেই আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন,“ বলেন সের্গেই। “তিনি এখন তুরস্কের সাথে ব্যবসা করেন। তিনি তুরস্কে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানাচ্ছেন। পুতিন যেটা ভুলে যাচ্ছেন তা হলো আমরা যদি ধ্বংস হয়ে যাই, তাহলে পুরো ককেশাস এবং রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চল তুরস্কের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। আমরা মরলে, সেই সাথে রাশিয়াও মরবে।“
আর্মেনীয়রা নাগোর্নো কারাবাখের সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিগোষ্ঠী। তারা এই অঞ্চলকে বলে আর্তসাখ। তাদের দাবি কয়েক প্রজন্ম ধরে এটি আর্মেনিয়ার অংশ। শুধু এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্যই নয়, কারাবাখের সাথে পুরো আর্মেনীয় জাতিগোষ্ঠীর ধর্মীয় এবং জাতিগত আবেগের সম্পর্ক রয়েছে।
স্টেপানাকার্টের একটি ক্যাফেতে আমার সাথে দেখা হয় আরা শানরিয়ানের। আর্মেনীয় বংশোদ্ভূত আরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলসের বাসিন্দা। নাগোর্নো কারাবাখে হামলা হয়েছে শুনে সমর্থন জানাতে তড়িঘড়ি করে তিনি আমেরিকা থেকে ছুটে এসেছেন।
“আমাকে আসতে হয়েছে,'' তিনি বললেন, “আমার মাতৃভূমি, আমার জনগণের জন্য যতটুক করতে পারি, তা করতে প্রস্তুত।''
যত মানুষের সাথে আমার এখানে কথা হয়েছে, তারা সবাই আবেগে ভাসছেন। আপোষের কথা তারা যেন শুনতেই রাজি নন।
“আর্তসাখে এত আগ্রাসন হয়েছে যে এই জায়গাটি দাবি করার সমস্ত নৈতিক অধিকার আজারবাইজান হারিয়েছে,'' রবার্ট আভেতিসিয়ান বললেন। নাগোর্নো কারাবাখ প্রশাসন তাকে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসাবে নিয়োগ করেছে।
আমি তাকে বললাম দুই পক্ষই সহিংসতা করছে। গাঞ্জাতে বহু বেসামরিক লোক মারা গেছে যে হামলার জন্য আজারবাইজান আর্মেনিয়াকে দায়ী করেছে। উত্তরে রবার্ট বললেন, “ঐ একই দিনে স্টেপানাকার্টে পাঁচটি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয়েছে যাতে অনেক মানুষ হতাহত হয়েছে।''
“তার কয়েকদিন আগে শহরের বিভিন্ন জায়গায় একশর মত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। আমরা কখনই বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করছি না। গাঞ্জায় সামরিক স্থাপনা ছিল'।'
কিন্তু গাঞ্জায় যে আবাসিক ভবনে হামলা হয়েছে, সেটিতো কোনো সামরিক স্থাপনা ছিলনা - আমার এ কথায় তার উত্তর ছিল, “অমি সেটা ঠিক জানিনা, আমি যেটা বলছি তা হলো আমরা কখনই ইচ্ছা করে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুকে নিশানা করছি না।'
চীন-অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কের এতো অবনতি হওয়ার কারণ কী, এই উত্তেজনা কতদূর গড়াতে পারে?
বেইজিং-এ অস্ট্রেলীয় দূতাবাসের সামনে একজন চীনা অফিসার।
অস্ট্রেলিয়া ও চীনের মধ্যে উত্তেজনা বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে এই সম্পর্ককে এক শ্বাসরুদ্ধকর ভূ-রাজনৈতিক থ্রিলারের মতো মনে হতে পারে।
কেউ জানে না এই গল্পটি কোন দিকে যাচ্ছে অথবা এটা কোথায় গিয়ে শেষ হতে পারে।
"অস্ট্রেলিয়া-চীন সম্পর্ক এতো জটিল ও এতো দ্রুত পাক খেয়েছে যা ছয় মাস আগেও চিন্তা করা যায়নি," লিখেছেন গবেষক জেমস লরেনসেন, তিনি ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি সিডনিতে অস্ট্রেলিয়া-চায়না রিলেশন্স ইন্সটিটিউটের পরিচালক।
শুধু গত কয়েক সপ্তাহে এই সম্পর্কের কতোটা অবনতি হয়েছে তার দিকে তাকালে এই পরিস্থিতি কিছুটা আঁচ করা সম্ভব হবে।
পাল্টাপাল্টি পুলিশি অভিযান
চীনা কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে অস্ট্রেলীয় নাগরিক এবং চীনে ইংরেজি ভাষার টিভি চ্যানেল সিজিটিএনের প্রখ্যাত সাংবাদিক চেং লেইকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি সন্দেহে আটক করা হয়েছে।
এর অল্প কিছুদিন পর, সর্বশেষ যে দুজন সাংবাদিক চীনে অস্ট্রেলিয়ার সংবাদ মাধ্যমের সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করতেন কূটনীতিকদের পরামর্শে তারাও তড়িঘড়ি করে অস্ট্রেলিয়াতে ফিরে গেছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ঘটনার বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে দুটো দেশের সম্পর্কের ওপর।
এবিসি চ্যানেলের রিপোর্টার বিল বার্টলস যখন তড়িঘড়ি করে বেইজিং ছেড়ে অস্ট্রেলিয়াতে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন চীনের সাতজন পুলিশ অফিসার মধ্যরাতে তার বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়।
শাংহাই-এ অস্ট্রেলিয়ান ফাইনান্সিয়াল রিভিউর সাংবাদিক মাইকেল স্মিথের বাড়িতেও পুলিশ একই ধরনের অভিযান চালায়।
তারা দুজনেই অস্ট্রেলিয়ার কূটনৈতিক মিশনে আশ্রয় গ্রহণ করেন। কিন্তু "জাতীয় নিরাপত্তার" বিষয়ে চীনা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের আগে তাদের চীন ছেড়ে যেতে বাধা দেওয়া হয়।
এরা দুজন অস্ট্রেলিয়াতে ফিরে যাওয়ার পরদিন চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমে বলা হয় যে এই ঘটনার আগে জুন মাসে অস্ট্রেলিয়ার গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বেশ কয়েকজন চীনা সাংবাদিককে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে এবং তাদের কাছ থেকে কম্পিউটার, মোবাইল ফোন জব্দ করে নিয়ে গেছে।
অস্ট্রেলিয়ার সংবাদ মাধ্যমে বলা হয়েছে সেদেশে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগে গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও পুলিশের তদন্তের অংশ হিসেবে চীনা সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল।
বাম থেকে: চীনে আটক চেং লেই , বিল বার্টলস ও মাইক স্মিথ দ্রুত অস্ট্রেলিয়াতে ফিরে গেছেন।
এর আগে নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের একজন এমপি শওকত মুসেলমানের অফিসে পুলিশ তল্লাশি চালিয়েছিল। তিনি চীনের একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিত। পরে তিনি বলেছেন যে, ব্যক্তিগতভাবে তিনি ওই তদন্তের আওতায় ছিলেন না।
অতি সম্প্রতি বেইজিং অস্ট্রেলিয়ার দুজন শিক্ষকের চীনে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর আগে অস্ট্রেলিয়া দুজন চীনা শিক্ষকের ভিসা প্রত্যাহার করে নেয়।
অন্য যে কোন সময় এরকম একটি ঘটনা ঘটলেই সেটা বেশ কিছু দিন ধরে সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম হয়ে থাকার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু এবার একের পর এক এধরনের পাল্টাপাল্টি ঘটনা ঘটতে থাকে।
এছাড়াও এসব ঘটনা এতো দ্রুত গতিতে ঘটে যায় যে পর্যবেক্ষকরাও বুঝতে পারছেন যে পরিস্থিতি আসলে কোন দিকে গড়াচ্ছে।
পিছনের গল্প
এই দুটো দেশের মধ্যে ক্ষোভ ও অবিশ্বাস গত কয়েক বছর ধরেই ভেতরে ভেতরে তৈরি হচ্ছিল।
এর মধ্যে মোড় ঘোরানো ঘটনাটি ঘটে যায় ২০১৭ সালে যখন অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা এসিও সতর্ক করে দেয় যে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় চীনের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা বেড়ে গেছে।
চীনা ব্যবসায়ীরা অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় রাজনীতিকদের অর্থ দান করেছে এরকম একটি অভিযোগও তখন সামনে চলে আসে।
সেবছরেই প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল অস্ট্রেলিয়ায় বিদেশি হস্তক্ষেপ ঠেকাতে কিছু আইন করার কথা ঘোষণা করেছিলেন। এর জবাবে চীন অস্ট্রেলিয়ায় তাদের কূটনৈতিক সফর স্থগিত রাখে।
ছবির ক্যাপশান,
বিশ্লেষকরা বলছেন চীন ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে এতো খারাপ সম্পর্ক সাম্প্রতিক ইতিহাসে কখনো ছিল না।
আরো যেসব কারণ
এর পর ২০১৮ সালে অস্ট্রেলিয়া জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সরকারিভাবে তাদের ফাইভ জি নেটওয়ার্কে চীনা প্রযুক্তি কোম্পানি হুয়াওয়ের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। অস্ট্রেলিয়াই প্রথম দেশ যারা এমন সিদ্ধান্ত নেয়। এর পর আরো বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন হয়তো অস্ট্রেলিয়ার প্রতি ক্ষুব্ধ হতে পারে, আবার এটাও ঠিক যে চীনের ক্রমবর্ধমান বৃহৎ অর্থনীতির চোখ পড়েছে অস্ট্রেলিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর।
এসব সম্পদের মধ্যে রয়েছে আকরিক লোহা, কয়লা এবং তরল গ্যাস। চীন থেকে এসব সম্পদ অস্ট্রেলিয়ায় রপ্তানি করা হয়।
এর পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ায় চীনা পর্যটক ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা থেকেও ক্যানবেরা প্রচুর অর্থ আয় করতে থাকে।
এধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা স্বত্বেও ২০২০ সালে দুটো দেশের সম্পর্কে নাটকীয় সব পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে।
অধ্যাপক লরেনসেন বলেন, "১৯৭২ সালে দুটো দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার পর বর্তমানে তাদের রাজনৈতিক সম্পর্ক সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছে।"
বিষয়: করোনাভাইরাস
করোনাভাইরাসের উৎস খুঁজে বের করতে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক তদন্তের আহবান জানানোর পর এই সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটেছে। এই ভাইরাসটি প্রথম শনাক্ত করা হয়েছিল চীনের উহান শহরে।
প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন এজন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে "অস্ত্র পরিদর্শকের মতো" ক্ষমতা প্রদানের আহবান জানান।
ছবির উৎস,GETTY IMAGES
ছবির ক্যাপশান,
অস্ট্রেলিয়া থেকে বার্লি আমদানির ওপর চীন শুল্ক আরোপ করেছে।
এছাড়াও অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পিটার ডাটন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে উদ্ধৃত করে বলেন ভাইরাসটি কীভাবে ছড়িয়েছে তার তথ্য প্রমাণ রয়েছে। তবে মি. ডাটন এও বলেন যে এসব কাগজপত্র তিনি দেখেননি।
চীনা কূটনীতিকরা কড়া ভাষায় এর জবাব দেন। তারা বলেন, মি. ডাটনকে হয়তো "যুক্তরাষ্ট্রের প্রোপাগান্ডা যুদ্ধে" সামিল হতে বলা হয়েছে।
প্রফেসর লরেনসন বলেন, সারা বিশ্বে শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় অস্ট্রেলিয়ার অবস্থানও চীনকে ক্ষুব্ধ করেছে বলে তিনি মনে করেন।
"চীন দেখতে পাচ্ছে যে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে," বলেন তিনি।
বাণিজ্য বিরোধ
এবছরের এপ্রিল মাসে অস্ট্রেলিয়ায় চীনা রাষ্ট্রদূত চেং জিংগে হুমকি দিয়েছিলেন যে চীনের লোকজন অস্ট্রেলিয়ার পণ্য বয়কট করতে পারে।
চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, "পরিস্থিতি যদি আরো খারাপ হয়... হয়তো সাধারণ লোকজন বলবে আমরা কেন অস্ট্রেলিয়ার ওয়াইন পান করবো? কেন অস্ট্রেলিয়ার গোমাংস খাবো?"
এর পরে চীন অস্ট্রেলিয়া থেকে বার্লি আমদানির ওপর ৮০% শুল্ক আরোপ করে। কিছু গোমাংস আমদানিও সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। ওয়াইন আমদানির ওপরেও তদন্তের ঘোষণা দেয়।
ছবির উৎস,GETTY IMAGES
ছবির ক্যাপশান,
বেইজিং চীনা নাগরিকদের অস্ট্রেলিয়া সফরের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছে।
এই বিরোধ এখানেই থেমে থাকেনি। কোভিড-নাইনটিনের কারণে চীনারা জাতিগত বিদ্বেষের শিকার হতে পারেন- এই কারণ দেখিয়ে চীনা ছাত্রছাত্রী ও পর্যটকদের অস্ট্রেলিয়ায় ভ্রমণের ব্যাপারে সতর্ক করে দেয় বেইজিং।
অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতির ওপর নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে চীনের প্রতি অস্ট্রেলিয়ার সাধারণ লোকজনের মনোভাবও তিক্ত হতে শুরু করে।
"ভয়ভীতি দেখানোর এই কৌশলের কারণে অস্ট্রেলিয়ার মনোভাব আরো শক্ত হয়েছে," বলেন নাতাশা কাসাম। লোওই ইন্সটিটিউট নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষক তিনি।
এই প্রতিষ্ঠানটির চালানো এক জরিপে দেখা গেছে অস্ট্রেলিয়ার ২৩% নাগরিক বিশ্বাস করে না যে চীন সারা বিশ্বে কখনো দায়িত্বপূর্ণ কোন ভূমিকা পালন করতে পারে।
মিস কাসাম আরো বলেন, চীন যখনই অস্ট্রেলিয়াকে ভয় দেখাতে চেয়েছে তখনই বেইজিং-এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার জন্যে অস্ট্রেলিয়ার ভেতরে সরকারের ওপর চাপ জোরালো হয়েছে।
হংকং-এ চীন যে নতুন নিরাপত্তা আইন জারি করেছে তারও কঠোর সমালোচনা করেছে প্রধানমন্ত্রী মরিসনের সরকার। শুধু তাই নয় হংকং-এর অনেক বাসিন্দাকে অস্ট্রেলিয়ায় চলে আসার জন্যও প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। হংকং-এর সাথে থাকা বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তিও বাতিল করা হয়েছে।
এসব কিছুই চীনকে ক্ষুব্ধ করেছে।
অধ্যাপক লরেনসেন বলেন, "তিন বছর ধরে দুটো দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিরোধ যে মাত্রায় গিয়ে পৌঁছেছে তাতে আমি বিস্মিত হয়েছি। মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার বার্লি, গোমাংস, ওয়াইন এবং চীনা শিক্ষার্থী ও পর্যটকের ব্যাপারে বেইজিং এমন কঠোর অবস্থানে চলে গেছে।"
"এখন দুশ্চিন্তার বিষয় হলো এটা কোথায় গিয়ে ঠেকে সেটাও পরিষ্কার নয়," বলেন তিনি।
ছবির উৎস,GETTY IMAGES
ছবির ক্যাপশান,
ম্যালকম টার্নবুল ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার শেষ প্রানমন্ত্রী যিনি ২০১৬ সালে চীন সফর করেছেন।
মিস কাসামও মনে করেন সম্পর্কের তিক্ততা যে পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে সেটা যে "ভাল কূটনীতির মাধ্যমে" ঠিক করে ফেলা যাবে সেটাও তার মনে হয় না।
"বর্তমান বৈশ্বিক পৃথিবীতে এটা কখনো সম্ভব নয় যেখানে চীন ক্রমশই একটি বৃহৎ শক্তিশালী রাষ্ট্র হয়ে উঠছে," বলেন তিনি।
দুটো দেশই জানে উত্তেজনা বৃদ্ধির সাথে সাথে ঝুঁকিও বাড়বে। গত সপ্তাহে চীনের একজন শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিক পরস্পরের প্রতি আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেওয়া বন্ধ করার আহবান জানিয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ায় চীনের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বেইজিং সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তি ফু ইং দুপক্ষের মধ্যে আরো ভালো যোগাযোগের আহবান জানিয়ে বলেছেন, বাণিজ্যের জন্য দুটো দেশেরই পরস্পরকে প্রয়োজন।
তার এই বক্তব্যই শুধু তাৎপর্যপূর্ণ নয়, তিনি যাকে একথা বলেছেন তাও সমান তাৎপর্যপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়ান ফাইনান্সিয়াল রিভিউর যে মাইকেল স্মিথকে চীন থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল তার কাছে তিনি এই মন্তব্য করেছেন।
অধ্যাপক লরেনসেন বলেন, চীন ও অস্ট্রেলিয়ার উৎপাদন কাঠামো এতোটাই পরিপূরক যে এরকম আরো দুটো দেশ খুঁজে পাওয়া কঠিন। তিনি বলেন, "অস্ট্রেলিয়া যা উৎপাদন করে চীনের সেটা দরকার।"
মিস কাসাম বলেন, বাণিজ্যকে রাজনৈতিক উত্তেজনা থেকে আলাদা করে রাখা যাবে না।
তিনি মনে করেন না যে দুটো দেশের মধ্যে খুব শীঘ্রই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। তবে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক কেমন হবে সেটা নির্ভর করে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘাত কতদূর গড়ায় তার ওপর।
0 Comments